
বিপুল সম্ভাবনাময় অথচ অনুন্নত শরীয়তপুর জেলা। বৃহত্তম ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর অঞ্চলের পূর্ব মাদারীপুর খ্যাত বর্তমান শরীয়তপুর জেলা। মাদারীপুর মহকুমা থেকে ভাগ হয়ে শরীয়তপুর প্রতিষ্ঠিত। দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও নবীন জেলা শরীয়তপুরে উন্নয়নের ঢেউ তেমন ভাবে লাগেনি। জেলাটি সবদিক দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে। শরীয়তপুরের পূর্বে মেঘনা নদী। উত্তরে প্রমত্তা পদ্মা নদী। মাঝখানে প্রবাহিত পদ্মার শাখা নদী কীর্তিনাশা। পশ্চিমে আড়িয়াল খা ও দক্ষিনে কীর্তিনাশা। নদী দ্বারা বেষ্টিত শরীয়তপুর নামক জনপদ প্রতিনিয়ত নদী ভাঙ্গনের শিকার জেলার শত শত মানুষ। বন্যা, খরা, বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টির কবলে মাঝে মধ্যেই পতিত হয় শরীয়তপুর নামীয় ভূখন্ডটি। নদী বেষ্টিত বিধায় দেশের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন শরীয়তপুর অঞ্চল। জেলার অভ্যন্তরীন সড়ক যোগাযোগও মান্ধাতার আমলের। নদী বেষ্ঠিত হলেও নৌ-যোগাযোগ তেমন ভালো কোন ব্যবস্থা নেই। ছোট ছোট লঞ্চ, ট্রলারই নৌ-যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। জেলাটি নদী বেষ্টিত বিধায় জেলার ভূখন্ড দু-ভাগে বিভক্ত। মূল ভূখন্ড সড়ক ও নদী পথের ভূখন্ড চর হিসেবে চিহ্নিত। সাবেক অঞ্চল ও চরাঞ্চলের মধ্যেও উন্নয়ন বৈষম্য ব্যাপক ভাবে বিরাজমান। সাবেক অঞ্চল উন্নয়ন অগ্রগতির ছোয়া কিছুটা লাগলেও চরাঞ্চলের উন্নয়ন অগ্রগতি কিছুটা কম। জেলায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন, পানীয় জল, আবাসন, কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকট বিরাজমান। স্বাস্থ্য, সমস্যা সাংবিধানিক মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত হলেও এখানে স্বাস্থ্য সমস্যা ব্যাপক ভাবে বিরাজমান। ৬টি উপজেলা, একটি থানা, ৬টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত শরীয়তপুর জেলা। ১৬ লক্ষ (আনুমানিক) জনসংখ্যা অধ্যুষিত শরীয়তপুর জেলায় ৬টি হাসপাতাল, প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার পরও জেলার মানুষ সার্বিক স্বাস্থ্য সমস্যায় দিনাতিপাত করছেন। স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান নেই। চিকিৎসক সহ অন্যান্যরা এখানে এসে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেননা। নানা সমস্যার কারনে তারা গ্রামে অবস্থান করতে চাননা। স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে ঔষধ সংকট বিরাজমান। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে জন-সাধারণ বঞ্চিত। তাই অসুখ-বিসুখ, রোগ-শোকে রাজধানী ঢাকাই শরীয়তপুরের মানুষের ভরসা। স্বাস্থ্যের মত শিক্ষাও সাংবিধানিক মৌলিক চাহিদা। শরীয়তপুরের মানুষ প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রশিক্ষণ থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত। প্রয়োজনের তুলনায় এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপ্রতুল। তার উপর রয়েছে শিক্ষক সংকট ও শিক্ষা উপকরণ সংকট। প্রাথমিক মাধ্যমিক ও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এর পূর্বের তুলনায় ভালো হলেও পর্যাপ্ত নয়। জেলার স্যানিটেশন সমস্যা একই। নানা কারণে টেকসই স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। আর্সেনিক প্রবনতার কারণে জেলার অনেক নলকুপ হুমকির মুখে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ভুগর্ভস্থ্য পানি স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া আবাসিক সংকট রয়েছে। নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ভিটে মাটি গৃহ হারা হয়ে আবাসিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এখানে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে। কোন কলকারখানা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠার কারণে কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।
শরীয়তপুর জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষি নির্ভর। কৃষি ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাহীন সংকট। প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল কৃষিতে ঝুকিঁ রয়েছে। এসব অন্তহীন সমস্যা জর্জরিত শরীয়তপুর জেলাকে ঢেলে সাজাতে হলে দরকার সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। যা এখনো শুরু হয়নি বললেই চলে। বিচ্ছিন্ন উন্নয়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলকে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জেলার সার্বিক উন্নয়নে প্রথমেই দরকার নদী ভাঙ্গন রোধ। নদী ভাঙ্গনের কারণে জেলার ভূখন্ড ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। এভাবে ভাঙ্গতে থাকলে কোন একদিন জেলাটি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে। অতি সম্প্রতি পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে নদীশাসন কার্যক্রম বাস্তাবায়ন হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং তা কেবল পদ্মা সেতু কেন্দ্রীক। শুধু পদ্মা সেতু কেন্দ্রীক নয় জেলার সার্বিক নদী ভাঙ্গন রোধ কল্পে ব্যবস্থা গ্রহণ বাস্তবায়ন দরকার। সে সাথে দরকার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা নেটওয়ার্কের সঙ্গে শরীয়তপুরকে অন্তর্ভুক্ত করা। সেটা করতে হলে চাঁদপুর শরীয়তপুর এলাকায় মেঘনা নদীর উপর সেতু নির্মান করে মংলা, পায়রা বন্দর থেকে চট্রগ্রাম মহাসড়ক সংযোগ স্থাপন করা। যা এখন মান্ধাতার আমলের সড়ক বন্দর যা ফেরী নির্ভর। সেই সাথে শরীয়তপুরের সুরেশ্বর থেকে মুন্সীগঞ্জে দিঘিরপাড় ফেরী সার্ভিস চালু করে সুরেশ্বর থেকে গোসাইরহাট হয়ে বরিশাল পর্যন্ত মহা সড়ক স্থাপন করে রাজধানী ঢাকাকে হাতের কাছে নিয়ে আসা। এটা করতে পারলেই জেলার সার্বিক অবস্থা পাল্টে যাবে। কলকারখানা গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যান্য সমস্যা কেটে যাবে। একই সাথে কৃষি নির্ভর শরীয়তপুরকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে জেলার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বেরিবাধ নির্মান করাও দরকার। এটা করতে পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে কৃষি ও কৃষক রক্ষা পাবে।
অবাক হওয়ার বিষয় আকাশ পথে শরীয়তপুর থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার। রাজধানী ঢাকার এত কাছাকাছি থেকেও শরীয়তপুরে মানুষ শহর সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এটা মেনে নেয়া যায় না। শরীয়তপুর ঢেলে সাজাতে পারলে শরীয়তপুর হতে পারে ঢাকার অংশ। তাই সমন্বিত কর্মসূচী গ্রহণ করে তা যথাযথ ভাবে বাস্তবায়ন করে রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে অবস্থিত শরীয়তপুরকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক যোগে কাজ করা উচিৎ।
– টি. এম. গোলাম মোস্তফা
১৫ এপ্রিল ২০১৯
আজকের শরীয়তপুর Ajker Shariatpur
Facebook Comments